ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তে নতুন সরকারের সামনে রাজস্ব চাপে শঙ্কা

0
113

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে নেওয়া একাধিক ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজস্ব চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি, ভাতা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত হলে নতুন সরকারকে ‘ব্যাপক চাপের’ মুখে পড়তে হবে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার উন্নয়ন ব্যয়ে বড় কাটছাঁট করে অপব্যয় কমানোর লক্ষ্য অনেকটাই অর্জন করেছে। তবে নিয়মিত বা পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। বরং রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকার মধ্যেই পরিচালন ব্যয় বাড়তে থেকেছে। এতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা আরও গভীর হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন ঘোষিত ব্যয়ের উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আগামী সরকারকে সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকলেও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে থাকা দরকার ছিল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পরবর্তী সরকারকে যেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চাপ নিতে হতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো, ভাতা সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী বৃদ্ধি, মৎস্য খাতে বিদ্যুৎ বিলে ছাড় এবং কিছু ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়।

বেতন কমিশনের সুপারিশই বড় চাপ

রাজস্ব চাপে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ। একটি আনুমানিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, শুধু মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও অধিদপ্তরের কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সশস্ত্র বাহিনী, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করলে ব্যয় আরও বাড়বে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এত বড় ব্যয় ঋণ নিয়ে বা টাকা ছাপিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তাঁর মতে, বাস্তবে দুটি পথই থাকে—রাজস্ব বাড়ানো অথবা অন্য খাতে ব্যয় কমানো। কিন্তু সরকারি ব্যয়ের অন্য খাত থেকে এত বড় অঙ্কের সাশ্রয় করা কঠিন। ফলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোই একমাত্র পথ, যা বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন।

বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অনুপাত বাড়ানো ছাড়া নতুন বেতন কাঠামো চালু করলে উন্নয়ন ব্যয় মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাড়তি ব্যয়

বেতন-সংক্রান্ত চাপের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, স্বাস্থ্য সহায়তাসহ নানা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নতুন পরিবার যুক্ত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি এবং ভিজিএফ কর্মসূচি সম্প্রসারণও হয়েছে।

এ ছাড়া প্রান্তিক মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিল ছাড় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার জন্য ১০০ কোটি টাকার তহবিল প্রয়োজন হবে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকার বাজেট প্রণয়নের সময় নেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল সুপারিশে সীমাবদ্ধ থাকা, আগাম ঘোষণা দিয়ে পরবর্তী সরকারের ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি না করা।

উন্নয়ন ব্যয় কম, বাস্তবায়নও দুর্বল

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ায়ও আর্থিক চাপ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ কমলেও প্রথম ছয় মাসে মাত্র ১৭ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সতর্ক করে বলেছেন, জিডিপির ৭–৮ শতাংশের মধ্যে রাজস্ব আদায় আটকে থাকলে কোনো উন্নয়ন কৌশলই সফল হতে পারে না। তাঁর মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের জন্য ঋণের ওপর নির্ভর করে টেকসই উন্নয়ন অর্জনের উদাহরণ বিশ্বে নেই।

শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমবে না

বেতন কমিশনের যুক্তির একটি অংশ হলো—বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে এবং সেবার মান বাড়বে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০১৫ সালের বেতন বৃদ্ধির পর দুর্নীতি কমেছে বা সেবার মান বেড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাঁর মতে, জবাবদিহির শক্ত কাঠামো ছাড়া শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নেওয়া ব্যয় সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তী সরকারের জন্য রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পরিসর সংকুচিত করেছে। সরকারি অর্থায়নের গভীর সংকট এড়াতে এখনই রাজস্ব সংস্কার ও ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি।


Previous article৪১ দফা ইশতেহার: স্বাস্থ্যবিমা ও ডিজিটাল হেলথ কার্ড চালুর ঘোষণা জামায়াতের
Next articleগণভোট ও নির্বাচনে ক্যারাভ্যানে প্রচারণার অনুমতি দিল ইসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here