চলতি অর্থবছরের মধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাত সংস্কার: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন গভর্নর।
গভর্নর বলেন, রিজার্ভ বাড়াতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজস্ব উৎস থেকেই রিজার্ভ বাড়ানো হবে। বাজারে চাপ সৃষ্টি করে নয়, বরং বাজারভিত্তিক অকশনের মাধ্যমেই ডলার কেনা হচ্ছে। অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নেওয়াই লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ অর্থনীতির একটি খারাপ সময় পেরিয়ে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরছে, ব্যালান্স অব পেমেন্ট ও ডলার পরিস্থিতি নিয়েও এখন বড় কোনো উদ্বেগ নেই।
তবে ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন গভর্নর। তিনি বলেন, অনেক ব্যাংকে এখনো মূলধন ঘাটতি রয়েছে। খেলাপি ঋণের হার অনুমানের চেয়েও বেশি বেড়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, এই হার ২৫ থেকে ২৭ শতাংশের মধ্যে থাকবে। কিন্তু প্রকৃত হিসাব অনুযায়ী তা প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা কোনো তথ্য লুকাব না। বাস্তব চিত্র যেমন, তেমনই প্রকাশ করা হবে।”
ব্যাংক সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান গভর্নর। এ বিষয়ে আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, একীভূত ব্যাংকগুলোর আমানত নিরাপদ থাকবে। আমানত বিমা ব্যবস্থার আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা থাকবে। নতুন কাঠামোয় পর্যাপ্ত মূলধন বিনিয়োগ হলে লোকসানের ঝুঁকি থাকবে না।
আলোচনায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে কার্যকর ক্যাপিটাল মার্কেট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মূল কাজের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে যুক্ত হতে হয়েছে। এতে শিল্পায়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিও বেড়েছে।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক দখলের ঘটনার পর থেকেই ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও প্রভাবশালী চক্রের আধিপত্য বাড়তে থাকে, যা পরবর্তীতে সংকটকে আরও গভীর করে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, একসময় ব্যাংকিং খাত নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখলেও নীতিগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ বিতরণের কারণে খাতটি আজ সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হতো। এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হিসাব করায় খেলাপি ঋণের হার হঠাৎ বেশি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় জাতীয় বাজেটের সমান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ ইতিবাচক উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, এসব সংস্কার ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ব্যাংকিং খাত সংস্কার নিয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।




















































