বহু বছর লাভে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (আইসিবি) বড় ধসের মুখে। অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া, উচ্চমূল্যে শেয়ার কেনা এবং পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতনের ফলে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান রেকর্ড ছুঁয়েছে।
আইসিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান করেছে ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও লোকসান ১৫১ কোটি। পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ারের আনরিয়ালাইজড লস (ফান্ড ইরোশন) দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, “স্বাভাবিক অবস্থায় আইসিবিকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব না।” তাঁর দাবি, পূর্বের ব্যবস্থাপনা ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে ‘ভেস্টেড গ্রুপের’ স্বার্থে উচ্চমূল্যের শেয়ার কিনেছে, যা এখন অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।
ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে আইসিবি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার সীমাও অতিক্রম করে। পরে শেয়ার বিক্রি করে সোনালী ব্যাংককে ৩৭৫ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়।
আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নীরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ জানান, উচ্চসুদের ঋণের বোঝা এখন সবচেয়ে বড় চাপ। শুধু সুদ পরিশোধেই প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে ৯০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, “পুঁজিবাজারে গতি না থাকায় মূলধনী লাভও কমেছে, অনেক শেয়ারে ইরোশন হয়েছে।”
রেনাটা–ইফাদ: লোকসানের বড় উদাহরণ
রেনাটা শেয়ারে ৯০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আইসিবি সর্বোচ্চ ১,৪৮০ টাকা দরে শেয়ার কিনলেও বর্তমানে দাম নেমে এসেছে ৩৮৯ টাকায়। শুধু এই শেয়ারে লোকসান ৫২১ কোটি।
ইফাদ অটোসের ক্ষেত্রে লোকসান ২১১ কোটি টাকা।
২০১৫–১৭ সালের মধ্যে কেনা শেয়ারেই পোর্টফোলিওর বড় দরপতন হয়েছে। এছাড়া অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার এফডিআরও ফেরত পাচ্ছে না আইসিবি—এক ব্যাংক ও ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা এফডিআর মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও টাকা আটকে আছে।
সুদেই খেয়ে ফেলছে আয়ের ৯৪%
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সাম্প্রতিক প্রেজেন্টেশনে জানানো হয়েছে, আইসিবির মোট আয়ের ৯৪ শতাংশই খরচ হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দায় ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা, এর মধ্যে ঋণ ১২ হাজার ২৭ কোটি।
সংকট কাটাতে আইসিবি সরকারের কাছে ১৩ হাজার কোটি টাকার সহায়তা চাইছে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার কোটি দিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।
দায়ী কারা?
আইসিবির ভেতরের সূত্র ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ, আগের বোর্ড ও পোর্টফোলিও বিভাগের কিছু কর্মকর্তা বাজার কারসাজিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনেছেন। সেই সময় দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তার সময়ে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ থেকে এখনই ফান্ড ইরোশন ১ হাজার ৬০০ কোটি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিবি সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের বোঝা না কমলে প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।


















































